স্বাধীন দেশ অনলাইন
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৩৫
সম্প্রতি বিএনপি নেতা মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের একটি বিতর্কিত মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ধর্মীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। নিকাবকে ‘মুসলিমদের পোশাক নয়’ দাবি করে তিনি এটিকে প্রাচীন ইহুদি নারীদের ‘অনৈতিক কাজের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য কেবল কাণ্ডজ্ঞানহীনই নয়, বরং লক্ষ কোটি মুসলিম নারীর ধর্মীয় অনুভূতি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত।
১. ইসলামের দৃষ্টিতে নিকাব: ইতিহাস ও বাস্তবতা
নিকাবকে ‘অচেনা’ বা ‘বহিরাগত’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামের আদি উৎসগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়:
* সহিহ বুখারি (হাদিস ১৮৩৮): রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন যে, ইহরাম অবস্থায় নারীরা নিকাব ও হাতমোজা পরবেন না। এই নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করে যে, সেই যুগে নিকাব নারীদের মধ্যে একটি অতি পরিচিত এবং সাধারণ পোশাক ছিল।
* পর্দার সংস্কৃতি: উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-সহ সাহাবী নারীদের জীবনে পর্দা ও নিকাব ছিল শালীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে ‘ইহুদিদের পোশাক’ বলা মূলত ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতারই নামান্তর।
২. পোশাক বনাম অপরাধ: একটি ভ্রান্ত সমীকরণ
মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর অপরাধের দায় পোশাকের ওপর চাপিয়ে যে ‘অশোভন সাধারণীকরণ’ করেছেন, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
* ব্যক্তির দায়: যদি কেউ নিকাব পরে অপরাধ করে, তবে সেটি ব্যক্তির অপরাধ, পোশাকের নয়। কেউ স্যুট পরে দুর্নীতি করলে যেমন স্যুট দোষী হয় না, তেমনি নিকাবকেও অপরাধের প্রতীক বানানো যুক্তিহীন।
* ভুল তথ্যের প্রচার: ইহুদি নারীদের নিকাব পরে ‘নিষিদ্ধ কাজ’ করার যে দাবি তিনি করেছেন, তার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ স্বকপোলকল্পিত এবং বিদ্বেষপ্রসূত।
৩. নারীর অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা
একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে নারী কী পরবেন, তা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
* মর্যাদার প্রতীক: বাংলাদেশের বহু নারী আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থেকে নিকাব বেছে নেন। তারা চান তাদের শরীর নয়, বরং তাদের মেধা ও ব্যক্তিত্ব মূল্যায়িত হোক।
* সাংবিধানিক অধিকার: রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালন ও পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্কে ধর্মীয় পোশাককে টেনে এনে নারীদের চরিত্রহনন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
উপসংহার ও প্রত্যাশা
রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবেই, কিন্তু সেটি যেন অন্যের শ্রদ্ধা ও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে। মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের মতো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে আসা এমন কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দ্রুত প্রত্যাহার ও সংশোধন করা প্রয়োজন। নারীর পোশাক নিয়ে উপহাস নয়, বরং তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষাই হওয়া উচিত আধুনিক সমাজ ও রাজনীতির মূল লক্ষ্য।

0 Comments